1. [email protected] : Faisal Ahmed : Faisal Ahmed
  2. [email protected] : Developer :
  3. [email protected] : Sylhet Press : Sylhet Press
প্রসঙ্গ : মানিকপীর সিটি গোরস্থান
বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৪৬ অপরাহ্ন

  • আপডেটের সময় : অক্টোবর, ২২, ২০২১, ২:৩৯ অপরাহ্ণ
প্রসঙ্গ : মানিকপীর সিটি গোরস্থান
ছবি- সিলেটপ্রেস

প্রসঙ্গ : মানিকপীর সিটি গোরস্থান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বেলাল আহমদ চৌধুরী :: জগতে একটি শিশু জন্মলাভ করা মাত্রই ধরে নেওয়া হয় মৃত্যু তার চরম ও শেষ পরিণতি। ‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা রবে’। মানুষ এবং সমস্ত জীব জন্তুই মরণশীল। এমনকি আল্লাহতায়ালা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে, সমস্ত কিছুই একদিন ধ্বংসের কোলে লুটিয়ে পড়বে, মোটকথা যে কোন কিছুর জন্ম হলেই মৃত্যু আছে একথার প্রতি বিশ্বাস রাখাও ঈমানের পরিচয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলেন, ‘কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাওত’ অর্থাৎ সকল প্রাণীই মরণশীল।

মৃত মুসলমান ব্যক্তিকে যে বিশেষ মৃত্তিকা গহ্বরে সমাহিত করা হয় সেটাই কবর বা সমাধিস্থল। কবর এমন এক জায়গা, যেখানে কে বস্তি থেকে এসেছে, আর কে ফুটপাত থেকে এসেছে সেটা বড় কথা নয়। কবর হলো একমাত্র আবাসস্থল যেখানে আমির-ওমরা, হাজী-গাজী আশরাফ-আতরাফ ধনী-গরীব সকল মৃতদের সাক্ষ পাই।

এইজন্য বলা হয় কবর : চিরস্থায়ী ঠিকানার প্রথম ধাপ। সমাধির উপর মৃতের পরিচিতি এবং গৌরবের বয়ান মৃত ব্যক্তির জন্য কিছু যায় আসে না। মৃত্যুর ডাক আর কিছুই নহে বাসা বদলের ডাক, সমাধি চিরস্থায়ী আবাসস্থল। মহানগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে নাগরিক সুবিধা যেমন আবশ্যক ঠিক তেমনি মৃত্যু পরবর্তী মৃতদেহের সৎকার ও গোরস্থানের সঠিক ব্যবস্থাপনাসহ সমাধিস্থলের উন্নয়ন, সংস্কার, সম্প্রসারণ বর্ধিতকরণ একান্ত আবশ্যক। নগরায়নের সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে, সেই সাথে চিরস্থায়ী ঠিকানা কবর বা গোরস্থান এবং শ্মশানঘাটের উন্নয়ন একান্ত আবশ্যক।

স্যামুয়েল বাটলার বলেছেন, মৃত্যু যার কথা মানুষ শুধু ভুলেই থাকে না ভুলেও যায়। আর যে ভোলে না সে অত্যন্ত মৃত নয়। দিনগুলি ক্ষুদ্র কিন্তু মানুষের কর্ম ক্ষুদ্র নয়। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর উন্নয়ন কর্মকান্ড নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তার প্রশংসনীয় কাজ-এ তর্ক আছে যুক্তি আছে, তবে গায়ের জোরের নয়, জনগণের চাহিদার শেষ নেই, এটা নেই, ওটা নেই, ওটার দরকার, ওটার দরকার। ওটা হলে আরেকটার দরকার। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে সিলেট মহানগরে সমাধিস্থল/গোরস্থান-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এ যাবত কোন দাবী উঠেনি। একজন নগরবাসী হিসাবে বিগত ০৪ মার্চ ২০১৯ দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় ‘মানিকপীর সিটি গোরস্থান উন্নয়ন প্রসঙ্গে’ আমার একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছিল। এতে আমি মানিকপীর গোরস্থানের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিষদভাবে বর্ণনা করেছিলাম। মেয়র সাহেব অনুসন্ধানী চোখে নিজ প্রজ্ঞায় হযরত মানিকপীর গোরস্থান জান্নাতুল বাকীর অবয়বে রূপান্তরিত করে চলেছেন যা তার অন্যতম কর্মযজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।

একটি তথ্য সূত্রে জানা যায়, হযরত মানিকপীর (রহ:) হযরত শাহজালাল ইয়ামনী (রহ:) এর সঙ্গে সুদূর আরব্য উপদ্বীপের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত প্রাচীন সভ্যতার আবাসভূমি ইয়েমেন হতে ১৩০৩ সালে সিলেট আগমন করেন। পরবর্তীতে হযরত শায়েখ মানিকপীর (রহ:) এবং হযরত ছোট পীর (রহ:) বর্তমান সিলেট মহানগরের ১৬নং ওয়ার্ডস্থ পূর্বে কুমারপাড়া, পশ্চিমে নয়াসড়ক ও কাজিটুলা, উত্তরে কাজিটুলা মক্তবগল্লী, মহলে আব্দুল্লাহ এবং দক্ষিণে চারাদিঘীর পাড়-এ মধ্যবর্তী টিলার সর্বোচ্চ চূড়ায় হুজরাখানা স্থাপন করে বসবাস করছিলেন এবং মহান আল্লাহর জিকিরের ধ্যানে তাছাউফের সাধনায় বুৎপত্তি লাভ করেন। হযরত শাহজালাল (রহ:) উভয়কেই পীর হিসাবে ভূষিত করেন। এই পীরদ্বয় ১৩০৫ সালে একই দিন একই সময়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

একটি সূত্র থেকে জানা যায়, হযরত মানিকপীর (রহ:) মৃত্যুর ১০৬ বছর পর অর্থাৎ (১৩০৫ + ১০৬) = ১৪১১ সাল থেকে যদি গড়ে প্রতিদিন একজন মৃতদেহ উক্ত টিলায় সমাধিস্থ করা হয় তাহলে বছরে ৩৬৫ জন  ১০০ (একশত) বছরে ৩৬,৫০০ জন (ছয়ত্রিশ হাজার পাঁচশত জন) সমাধিস্থ হলে (১৪১১২০২০) = ৬০৯ বছরে ৩৬,৫০০  ৬০৯ বছরে ২,২২,২৮,৫০০ জন মৃত ব্যক্তিকে মানিকপীর টিলায় মৃত্তিকা গহ্বরে সমাধিস্থ করা হয়েছে। রোজ কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত এই টিলায় মৃতের কবর দেয়া হবে। এ তথ্য থেকে অনুমিত হয় হযরত মানিকপীর গোরস্থান সিলেটের একটি প্রাচীনতম চির নিদ্রার ঠিকানা।

হযরত মানিকপীর টিলায় কন্টুরকরে ভূমির ঢালে আরসিসি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। টিলার মাটি ধসে পড়ার সম্ভাবনাকে সাপোর্ট দিয়ে ব্রেষ্ট ওয়াল এবং রিটেনিং ওয়াল দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে টিলার বাঁক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশের সংযোগ ক্ষেত্রে সরল দৈর্ঘ্য উলম্ব নিয়ন্ত্রণ ঢাল বিশেষভাবে কার্যকর করা হয়েছে। সমগ্র টিলা কাজিটুলা মহলে আব্দুল্লাহ এবং মক্তবগল্লী হয়ে পশ্চিমে ঘুরে ১নং ফটকে এসে মিলেছে। তাছাড়া ভূপৃষ্ঠস্থ পানি সহজে অপসারিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত লম্বা-লম্বি ঢালে প্রয়োজনীয় ড্রেন রাখা হয়েছে। তাছাড়া আরামদায়ক চলাচলের জন্য আরসিসি সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এবং উত্তর-পূর্ব দিকে টিলার চূড়ায় উঠার জন্য সিঁড়ি তৈরী করা হয়েছে। গোরস্থানের নিঃশীম অন্ধকার দূরভিত করার জন্য পুরো টিলায় বৈদ্যুতিক আলোয় দীপ্তিময় করে তোলা হয়েছে।

সিসিক কর্তৃপক্ষ পুরো গোরস্থান টিলা কয়েকটি ব্লকে ভাগ করেছেন। ইতিমধ্যে এ-ব্লকের কাজ শেষ হয়েছে এবং ২৭ মে ২০২১ মৃতদেহ সমাধিস্থ করার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ-ব্লক গোরস্থানে পরিদর্শন পথ, পার্শ্ব পরিদর্শন পথ তৈরি করা হয়েছে। পুরো গোরস্থানে উন্নয়নমূলক ও কাজ দ্রতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তাছাড়া সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পশু পাখির খাদ্য ও ছায়া প্রদানের জন্য গোরস্থান জুড়ে ১. ফাই গোলাপ, ২. নীল কৃষ্ণচূড়া, ৩. সুপারি, ৪. নিম, ৫. চায়নাটগর, ৬. গগন শিরিশ, ৭. কৃষ্ণচূড়া, ৮. কামিনী, ৯. আম, ১০. কাট গোলাপ, ১১. রুদ্র পলাশ, ১২. আমলকি, ১৩. গাব, ১৪. মিতিঙ্গা বাঁশ, ১৫. সোনালু, ১৬. ভুবন বিলাস, ১৭. জলপাই, ১৮. কাঠকাদাম, ১৯. নারিকেল, ২০. বটল ব্রাম, ২১. কাট গোলাপ, ২২. শিউলি সহ মিশ্র ফলজ ও বনজ বাগানের চারা সৃজন করা হয়েছে। হযরত মানিকপীর (রহ:) গোরস্থানের প্রধান ফটকের পশ্চিমদিকে অফিস কক্ষের নিকটে একটি শৈল্পিক স্থাপত্যের ওজুখানা ও ওয়াসরোম তৈরি করা হচ্ছে।

একজন নগরবাসী হিসাবে গোরস্থানের উন্নয়নমূলক চলমান কাজে আরও কতিপয় পরামর্শ উপস্থাপন করছি :

১. টিলার সর্বোচ্চ চূড়ায় হযরত মানিকপীর (রহ:) মাজার ও হুজরাখানাকে শৈল্পিক স্থাপত্যে মুসলিম সংস্কৃতির ঐতিহ্যে ফুটিতে তুলতে হবে এবং হুজরাখানার পার্শ্বে ইবাদতখানা স্থাপন বিদ্যুৎসহ পানির ব্যবস্থা দেবার পরামর্শ করছি।

২. হযরত মানিকপীর (রহ:) টিলার উত্তর-পূর্ব-পশ্চিমে কাজিটুলা, মহলে আব্দুল্লাহ এবং মক্তবগল্লী দিক থেকে টিলায় লাশ কবরস্থ করার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে করে শুধুমাত্র টিলার দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ প্রধান ফটকের দিকে লাশ দাফনের চাপ কমবে।

৩. হযরত মানিকপীর (রহ:) টিলার উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিমদিকে নিরাপত্তা চৌকি নির্মাণ করার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে করে পুরো গোরস্থান এলাকা নিরাপদ থাকবে।

৪. ১নং ফটক দিয়ে হযরত শায়েখ মানিকপীর (রহ:) মাজার পর্যন্ত ২৩০টি সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে যেতে প্রথমেই চোখে পড়ে ১৯৪৭ সালের ২৪ এপ্রিল সিলেট ডিসি কোর্টে বৃটিশ পতাকা অপসারণ করে মুসলিম লীগের ‘আল হেলাল’ পতাকা উত্তোলনকারী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মোঃ আব্দুল বারী (ধলাবারী) সমাধিস্থল এবং তারই নিকটে সমাধিস্থ পাকিস্তান আন্দোলনের মোজাহিদ শহীদ আলকাছ আলী। তিনি ১৯৪৪ ইং ২৪ এপ্রিল বৃটিশ বাহিনীকে পরোয়া না করে তৎকালীন থানার ছাদে উঠে বৃটিশ বাহিনীর ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ পতাকা নামিয়ে আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় বৃটিশ বাহিনীর বুলেটের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন। তাছাড়া ১নং ফটকের সামান্য পশ্চিম দিকে বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা শায়েখ শফিকুল হক আমকুনী (রহ:) আরও আছেন সিলেটের জননন্দিত নেতা সিলেট মহানগরের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সাবেক মেয়র আ.ফ.ম কামাল-এর সমাধিস্থল রয়েছে। তাছাড়া হাজারও ওলী, আউলিয়া, কবি-সাহিত্যিক চিরনিদ্রায় রয়েছেন। এইসব কীর্তিমান মনীষীর আলোকিত রাজনৈতিক ধর্মীয় জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আবশ্যক। এতদ্বিষয়ে সিসিক কর্তপক্ষকে পদক্ষেপ নেবার জন্য সুপারিশ করছি।

৫. হযরত মানিকপীর (রহ:) গোরস্থান চলমান উন্নয়নে মৃত ব্যক্তির গোসলের জায়গা, মৃতের জানাযার ইয়ার্ড-এর ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করছি।

৬. সিসিক কর্তৃপক্ষ লাশ বহনের জন্য একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক থাকার ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করছি এবং গোরস্থান অফিসে সিসি ক্যামেরা সংযোগের ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ জানাচ্ছি।

৭. সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য সহ হযরত মানিকপীর (রহ:) গোরস্থানে যে আলেমে দ্বীন বরেণ্য গুণীজন শায়িত আছেন তাদের জীবন গাঁথা নিয়ে একটি তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে এবং মাজার অফিসে একটি পরিদর্শন বহি রাখা যেতে পারে। যাতে দেশ-বিদেশের আগন্তুক তাদের মূল্যবান অভিমত ব্যক্ত করতে পারেন।

৮. প্রধান ফটকের কাছে রাস্তার লাগোয়া সীমানা দেওয়াল আল কুরআনের আয়াতের ক্যালিওগ্রাফি করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
জননন্দিত মেয়র শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেননি, তিনি সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্রগুলোকে হৃদয়বৃত্তির মাধুর্য দিয়ে আলোকিত করছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট এখন সগৌরবে প্রকাশমান। হযরত মানিকপীর (রহ:) গোরস্থানের নান্দনিক সৌন্দর্য ইতিহাসের পথ রেখায় আগামী প্রজন্মের কাছে তাকে অমর করে রাখবে।
পরিশেষে বলি, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুরী’-‘হে পথিক একটু দাঁড়াও, আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করে যাও। আজ তোমরা যেভাবে আছ, গতকাল আমরা সেভাবে ছিলাম। আজ আমরা যেভাবে আছি, আগামীকাল তোমরাও সেভাবে থাকবে। এই প্রার্থনা থেকে জ্ঞানবুদ্ধি সম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবনের অধিকারী সকলেই এই সত্য অনুধাবন করতে হবে। সৌজন্যে দৈনিক সিলেটের ডাক

লেখক : কলামিস্ট।

সিলেটপ্রেসবিডিডটকম /২২ অক্টোবর ২০২১/ এফ কে


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এই বিভাগের আরও খবর


© All rights reserved © 2020 SylhetPress
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ