লজিং জীবন (পর্ব-৫) – SylhetPressbd

লজিং জীবন (পর্ব-৫)

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

লজিং জীবন (পর্ব-৫)

সৈয়দ আহমদ :: ‘সুন্দর জীবন কোনো ভাগ্যের লিখন নয়, কাজ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে হয়’-ক্যালনিন। ‘জীবনের মালিক তুমি নিজেই। দুঃখ, বেদনা, আর অভাবকে বাধা মনে না করে বরং সেগুলিকে আশির্বাদ রূপে ধরে নাও, দেখবে কিছুতেই কেহ তোমার গতিকে রোধ করতে পারবে না। যেমন করেই হউক তুমি বড় হবেই। বুক ভেঙ্গে গেছে ভয় নেই, ভাঙ্গা বুক নিয়ে আল্লাহ ভরসা করে দাঁড়াও, সাফল্য আসবেই’-ডাঃ লুৎফুর রহমান।

পৃথিবীতে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সকল দাবি দাওয়া আদায় ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। যেখানে সংগ্রাম নেই, প্রতিবাদ নেই, সেখানে কোনো উন্নতিও নেই। যারা মুক্তির স্বপক্ষে কথা বলেন অথচ আন্দোলন সমর্থন করেন না বা আন্দোলন করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, তারা বিনা চাষেই ফসল উৎপাদন করে ঘরে তোলতে অভিলাসী। তারা বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমক ছাড়াই বৃষ্টিপাত প্রত্যাশা করে থাকেন। ঢেউ এর আঘাত সহ্য না করেই সমুদ্র ¯œানের প্রত্যাশা করেন। পানিতে গা না ভিজিয়ে মাছ ধরতে চান। এ ধরনের সংগ্রাম নৈতিক বা দৈহিক তো বটেই উভয় প্রকারেরও হতে পারে। কেননা সংগ্রাম ছাড়া পথ নেই, দাবি ছাড়া কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়।

আমরা যদি পুঞ্জিভূত অন্যায় ও উৎপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পেতে চাই, তবে আমাদেরকে মূল্য দিতেই হবে। মূল্য দিতে গিয়ে, পরিশ্রম, কষ্ট ত্যাগের মাধ্যমে তো বটেই প্রয়োজনে জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হবে। কেননা মহৎ কাজ করে যশ অর্জন করতে চাইলে জীবনের প্রথম থেকেই সংগ্রাম করতে হয়। সৃষ্টিকর্তা কাউকেই সম্রাট  ভিজাত, জমিদার, আমির, ওমরাহ, মন্ত্রী, মিনিস্টার অথবা কোটিপতি করে সৃষ্টি করেন না। সবার জন্ম হয় নগ্ন, নিঃস্ব, অসহায় ও বৈভবহীন অবস্থায়। সকলেই জীবনে নানা ধরনের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ, আশা-নিরাশা ও পাপ পুণ্যের কর্মফলের পরিনাম ভোগ করে থাকে। কেননা মানুষের জীবন মানুষের ইচ্ছার উপর নয় বরং নিজ কর্মের উপর দন্ডায়মান। তাই কর্মই মানুষকে মহিমান্বিত করে তুলে, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কান্ডারীর ভূমিকা রাখে।

১৯৬৯ সাল, অতি কষ্টের বিনিময়ে ৭ম শ্রেণীর সার্টিফিকেট সংগ্রহের পর পুনরায় ভর্তি হওয়া নিয়ে সংকটের মধ্যে পড়লাম। কেননা তখন সুনামগঞ্জ মহকুমায় অর্থাৎ বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। তখন কোনো কোনো থানা সদরেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। কিন্তু তখনকার সময়েও আমাদের নিজ থানা, ছাতক বাজার অঞ্চলে দু’টি পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল। একটি ছাতক মডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং অন্যটি ছাতকের আফজলাবাদ ইউনিয়নের গোবিন্দগঞ্জ নতুন বাজার সংলগ্ন গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। আমি আমার পিতার কাছে বর্ণিত স্কুলে ভর্তি হতে চাই বলায়, তিনি আমাকে নিজ চেষ্টায় ভর্তি হওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। তাই আমি একদিন ছাতক বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে আসলাম। প্রধান শিক্ষকের কাছে ভর্তি হওয়ার জন্য আলাপ করায় তিনি আমার নাম ও ঠিকানা জেনে বল্লেন ‘বাপু তুমি দোয়ারাবাজার অঞ্চলের বাংলাবাজার থেকে প্রতিদিন ৭/৮ মাইল রাস্তা হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে পারবে না। তাছাড়া রাস্তাঘাটের যে অবস্থা বর্ষাকালে তো আরও খারাপ অবস্থা হয় তাই আগে লজিং বা আশেপাশে কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে তারপর ভর্তি হতে এসো।

তোমাকে আমার স্কুলে ভর্তি করতে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের সাদামাটা কথাশুনে আমার মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেলো। ফলে আর কোনো কথা না বলে বাড়িতে চলে আসলাম এবং ছাতক বাজারের নিকটস্থ বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়ায় লজিং খোঁজছিলাম। এবং হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলাম। পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষকেই জীবনের কত ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়। একজন মানুষের জীবনে যতটুকু সাফল্য আসে তার থেকে ব্যর্থতা আসে অনেক বেশি। সেই অনাকাক্সিক্ষত ব্যর্থতার জন্য কী মানুষকে জীবনের হাল ছেড়ে দিতে হবে। বরং সে ব্যর্থতাকে পিছনে ফেলে নতুন উদ্যমে কাজ করলে ভবিষ্যতে যে আরো কত সুন্দর জীবন ও সাফল্য অপেক্ষা করছে তা কি আমরা কল্পনা করতে পারি?

আমাদের পাশের গ্রাম পাইকপাড়া নিবাসী মৌলানা সফির উদ্দিনের ছেলে মোঃ নূরুল হক ও জনাব শাহাব উদ্দিনের ছেলে মোঃ মতলুব হোসাইন উভয়ই চাচাতো ভাই ও আমার সম্পর্কে মামা হয়। তারা তখন গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। আমি জনাব মতলুব হোসাইনের সাথে বাজারে সাক্ষাৎ করে উনার স্কুলে ভর্তি হওয়া যাবে কিনা বা তিনি আমাকে কতটুকু সহযোগিতা করতে পারবেন জানতে চাইলে তিনি আগামীকালই গোবিন্দগঞ্জে যাবেন যদি ভর্তি হতে চাই তবে যেন উনার সাথে কালকেই সঙ্গী হই।

কথামত উনার সাথে গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলাম। তখন উক্ত স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম একেএম শামছুল হক (ছমরু মিয়া)। অনুমতি নিয়ে মতলুব হোসেন স্যারের কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং স্যারকে আমার পরিচয় দিয়ে অত্র স্কুলে ভর্তি হতে চাই বলে জানালেন। হেড স্যার আমার ঠিকানা জেনে বল্লেন, ‘তুমি লজিং ছাড়া এ স্কুলে পড়তে পারবে না, তাই তুমি আজই বাড়ি চলে যাও এবং বিছানাপত্র নিয়ে আমার বাড়িতে চলে এসো। যতদিন তোমার জন্য লজিং এর ব্যবস্থা করতে না পারবো ততদিন তুমি আমার বাড়িতে থেকে স্কুলে ক্লাশ করবে। লজিং ঠিক হলে চলে যাবে’।

আমি হেড স্যারের আন্তরিকতা ও মহত্ব দেখে এবং উনার কথায় যথেষ্ট ভরসা পেলাম এবং স্যারকে শ্রদ্ধার সাথে বললাম ‘স্যার আজ আমি বাড়িতে চলে যাব। লজিং এর ব্যবস্থা হলে মতলুব হোসাইনের মাধ্যমে আমাকে জানালে আমি চলে আসব’। সেদিন স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসাবে কতটুকু আন্তরিকতা, মহত্ব ও দায়িত্ব থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করা যায় তা উনার ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি আন্তরিকতা, মমত্ববোধ কথায় ও কাজের মধ্যেই ফুটে উঠেছিল। তাইতো তিনি সেদিন আমাকে লজিং না পাওয়া পর্যন্ত উনার বাড়িতে থাকার জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একজন শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষাদরদী হিসাবে তিনি ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ দাতা ও পরহিতব্রতী শিক্ষানুরাগী খাঁটি দেশপ্রেমিক। আসলে তিনি ছিলেন মানবতা প্রেমের মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত একজন দীপ্তিমান ব্যক্তিত্ব। শুধু তাই নয়, জন্মভূমি তথা মা, মাটি ও মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন বলেই উনার সকল কর্ম ছিল উৎসর্গীকৃত।

তাই ছমরু মিয়া স্যারের সুনাম, যশ ও খ্যাতির জন্য আমরা আজও গর্ববোধ করছি। তিনি শুধু খ্যাতিমান অসাধারণ শিক্ষকই ছিলেন না বরং গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের জন্য ছিলেন আলোকবর্তিকা। তাইতো প্রথম সাক্ষাতেই আমি উনার জ্যোতির্ময় আলোয় আলোকিত হয়ে গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথম দিনই তিনি মতলুব হোসেন মামাকে ডেকে এনে আমার জন্য লজিং এর ব্যবস্থা করে স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। স্যারের নির্দেশ মোতাবেক মতলুব হোসেন মামা এক সপ্তাহের মধ্যে আমার জন্য লজিং এর ব্যবস্থা করে আমাকে জানালেন।

আমার জন্য যে গ্রামে লজিং ঠিক করা হলো, সে ঐতিহ্যবাহী গ্রামটির নাম ছিল ‘শিবনগর’। ‘শিবনগর’ গ্রামটি ছাতক উপজেলাধীন গোবিন্দগঞ্জ নতুনবাজার সংলগ্ন বা ছাতক বাজার হতে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে সিলেট-সুনামগঞ্জ আন্তঃজেলা মহাসড়কের সংযোগস্থল বা তেমুখী পয়েন্ট হতে অথবা গোবিন্দগঞ্জ নতুন বাজারের পশ্চিমে ও বটেরখাল নদীর উত্তর পাড়ে ছাতক-সিলেট রেল লাইনের পূর্ব পার্শ্বে স্থাপিত ‘গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’ থেকে প্রায় এক দেড় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ভটেরখাল নদীর পূর্ব-দক্ষিণ পারে অবস্থিত।

আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও দরবেশ আফজল শাহ এর নামানুসারে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী আফজলাবাদ রেল স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ভটেরখাল নদীর পার ঘেসে গ্রামটির অবস্থান। স্যারের কথা অনুযায়ী স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই জনাব মতলুব হোসেন মামা শিবনগর গ্রামের দক্ষিণ পাশের ভটেরখাল নদী ও শিবনগর খালের সংযোগ স্থলের নিকট নদীর তীরবর্তী জনাব মদরিছ আলীর বাড়িতে আমার জন্য লজিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আমার জীবনের জন্য এটি হলো তৃতীয় লজিং। শিবনগরের ৩য় লজিং বাড়িতে এসেই পরের দিন গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম এবং প্রধান শিক্ষক ছমরু মিয়া স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি অবহিত করে স্যারের পরামর্শ ও দোয়া চাইলাম। কিন্তু এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই লজিং বাড়িতে নানা সমস্যা ও অসুবিধা দেখা দিচ্ছিল। সমস্যাগুলো তীব্র হওয়ায় এবং বসবাসের বৈরী অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায়, শিবনগরের তৃতীয় লজিংটিতে একমাসের বেশি অবস্থান করা সম্ভব হয়নি। আমার সহপাঠী ও বন্ধু আমার পাশের গ্রামের জনাব রমিজ উদ্দিনও আমার পাশের গ্রামে লজিং থেকে একই সাথে উক্ত গোবিন্দগঞ্জ স্কুলে পড়ছিলাম। সে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছিল। সে আমার অবস্থা শুনে ও বুঝে এক সপ্তাহের মধ্যে লজিং এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ফলে আমি স্বল্প সময়ের মধ্যে শিবনগরের লজিংটি ছেড়ে দিয়ে পুনরায় ৪র্থ লজিং এ চলে আসি। রমিজ উদ্দিন যে গ্রামটিতে লজিং থাকতো আমার জন্য সেই গ্রামেই লজিং ঠিক করেছিল। আমার ৪র্থ লজিংটির গ্রামের নাম ছিল ‘নোওয়াপাড়া’। চলবে

আরও পড়ুন : লজিং জীবন পর্ব ( ৪ )

সিলেটপ্রেসবিডিডটকম/১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০/এফ কে 

  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

Send this to a friend